A+
A-

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা রচনা

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা রচনা | বিজ্ঞানের জয়যাত্রা | রচনা বিজ্ঞানের জয়যাত্রা | বিজ্ঞানের জয়যাত্রা রচনা class 10 | বিজ্ঞানের জয়যাত্রা প্রবন্ধ রচনা | বিজ্ঞানের জয় যাত্রা রচনা | বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও মানুষের ভবিষ্যৎ রচনা

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা

ভূমিকা : বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রার এক বিস্ময়কর যুগ হলো বর্তমান যুগ। এক সময়ের গুহাবাসী অরণ্যচারী মানুষ আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে ছুটে চলেছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। বর্তমানে মানুষের জীবনে যে অভাবনীয় বেগের সঞ্চার হয়েছে, বিজ্ঞানেরই অবদান। বিজ্ঞানের কল্যাণেই সভ্যতার অগ্রযাত্রা হয়ে উঠেছে দ্রুততর ও এটা বহুমাত্রিক। দূর-দূরান্তের ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানই মানুষকে দিয়েছে সীমাহীন সম্ভাবনার অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা।

বিজ্ঞান কী : বিজ্ঞান শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Science। এটি গ্রিক শব্দ Scio থেকে এসেছে, যার অর্থ জানা বা শিক্ষা গ্রহণ করা। আভিধানিক অর্থে বিশেষ জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান। এ সম্পর্কে মনীষী স্পেন্সার বলেন, “বিজ্ঞান হলো সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ জ্ঞান।" বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গড়ে উঠেছে বিজ্ঞানজগৎ, যা ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষকে পৌঁছে দিয়েছে আধুনিক সভ্যতার মণিকোঠায়।

বিজ্ঞানের উদ্ভব : মানুষের বিশেষ কৌতূহলের চেতনায় অতি প্রাচীনকালেই বিজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটেছিল। প্রাকৃতিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রেরণাকে সঞ্চারিত করেছে। আর এই প্রেরণার বশেই পরবর্তীকালে মানুষ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে ব্রতী হয়েছে এবং বিজ্ঞানকে নিজেদের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।

জীবন ও বিজ্ঞান : প্রয়োজনই উদ্ভাবনের প্রেরণা যোগায়। মানুষের অভাববোধ থেকে বিশেষ জ্ঞান হিসেবে বিজ্ঞানের উৎপত্তি। তাই জীবনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক যেমন পুরনো, তেমনি নিবিড়। সভ্যতার শুরুতে বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মানুষ ছিল প্রকৃতির হাতের পুতুল। পশুসদৃশ গুহাবাসী মানুষ যখন প্রথম পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালায় তখন থেকেই শুরু হয় মানুষের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। এরপর মানুষের অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা ও আগ্রহ থেকে ঘটেছে বিজ্ঞানের বিচিত্র বিকাশ। মানুষ যেখানেই বাধার সম্মুখীন হয়েছে, কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, ব্যবহার করেছে বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেই আজ মানুষ সমগ্র পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব করছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সংস্কার, বিশ্বাস ও প্রবণতার মাঝেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আজ মানুষ যা কিছু দেখে বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়েই দেখে, বিজ্ঞানের প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রহণ করে। মানুষের এ জিজ্ঞাসা ও তর্কের প্রবৃত্তি বৈজ্ঞানিক পরিবেশের ফল। মূলত মানুষকে গুহাবাসী অবস্থা থেকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করেছে বিজ্ঞান।

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা : বিজ্ঞানের জয়যাত্রা বিশ্লেষণে সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিবর্তনকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে- ১. প্রাচীন যুগ, ২. মধ্য যুগ, ৩. আধুনিক যুগ ও ৪. সর্বাধুনিক যুগ।

১. প্রাচীন যুগ : গুহাবাসী পশুসদৃশ মানুষ প্রথম পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালিয়ে বিজ্ঞানের যাত্রাপথের সূচনা করে। জীবন ধারণের তাগিদে খাদ্য সংগ্রহের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলো তাদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উর্বর জমিতে কৃষিকাজের উপায় উদ্ভাবন করে। রোগের চিকিৎসায় গাছ-গাছালি, তাবিজ- কবচ ও ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করার পদ্ধতিও তারা আবিষ্কার করে ফেলে। চিন্তার প্রখরতা দিয়ে তারা অক্ষর আবিষ্কার করে শিক্ষার অঙ্গনেও পা রাখে। ছোটখাটো আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সহজ করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে তারা। এভাবে পর্যায়ক্রমে মানুষ প্রবেশ করে সভ্যতার মধ্যযুগে।

২. মধ্য যুগ : চাকার আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ প্রবেশ করে মধ্যযুগে। বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হিসেবে ধরা হয় এই চাকাকে। মানুষের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ধারা অব্যাহত থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রে মানুষ এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। কৃষিক্ষেত্রে লাঙ্গল ও মইয়ের ব্যবহার এবং সেচ কাজে নদীর পানি ব্যবহার সম্পর্কে মানুষ এ যুগেই জানতে পারে। ব্যবসায়-বাণিজ্যে তাদের অগ্রগতিও ঘটে চোখে পড়ার মতো। বৈজ্ঞানিক চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এ যুগে মানুষ তাদের জীবনযাপনকে অনেকটা সহজ-সরল করে তোলেন। বিজ্ঞানের বদৌলতে কবিরাজি চিকিৎসার মূলে হোমিওপ্যাথিক ও এলোপ্যাথিক চিকিৎসার উদ্ভব হয়। সংকটাপন্ন মানুষের জীবন অনেকাংশে রক্ষা পায় এ আবিষ্কারের ফলে। মধ্যযুগে মানুষের চিন্তাশক্তির এক অসাধারণ পরিচয় পাওয়া যায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। ধ্রুবতারা দেখে সমুদ্রের গতিপথ নির্ণয়- করতে শেখে মানুষ মধ্যযুগেই। এরপর ধীরে ধীরে মানুষ শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন আবিষ্কারের প্রতিও তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

৩. আধুনিক যুগ : চাকার আবিষ্কার ছিল আধুনিক যুগে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রথম ধাপ। আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলো বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে মানুষের অন্ধকারময় জীবন নিমিষেই আলোকিত হয়ে উঠেছে। ট্রাক্টর, কীটনাশক, রাসায়নকি সার প্রভৃতির আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আধুনিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কার শিল্পক্ষেত্রেও এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন/ বিদ্যুৎ চালিত বাতি, ফ্যান, টেলিভিশন প্রভৃতি মানুষের জীবনকে করেছে স্বাচ্ছন্দ্যময়। দ্রুতগামী যানবাহন, বুলেট ট্রেন, শব্দতিগ উড়োজাহাজ প্রভৃতির আবিষ্কার দূরকে পরিণত করেছে নিকটে। আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো কম্পিউটার। যার সাহায্যে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল ক্ষেত্রেই এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থাকে করেছে আরো আধুনিক ও উন্নত। কম্পিউটার শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেছে। রঞ্জন রশ্মি, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি প্রভৃতি আবিষ্কার রোগ নির্ণয়কে সহজ করেছে। ১৯০৩ সালে আবিষ্কৃত জিনের গঠন প্রণালি, ইসিজি মেশিন এবং মরণব্যাধি ক্যান্সার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি, ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন, ১৯৪৩ সালে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, ১৯৭৮ সালের টেস্টটিউব প্রজনন পদ্ধতি এবং ১৯৯৭ সালে আবিষ্কৃত কোন পদ্ধতি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে অভাবনীয় উন্নতি। আধুনিক যুগের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের অবতরণ, যা বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর সফলতার দৃষ্টান্ত। বৈজ্ঞানিক মননশীলতার বিকাশের ফলস্বরূপই আজ মানুষ আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বিপদসংকেত প্রভৃতি জানতে পারছে।

৪. সর্বাধুনিক যুগ : বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সর্বাধুনিক যুগ হলো তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। এ যুগে ই-মেইল, ইন্টারনেট প্রভৃতির কল্যাণে গোটা বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনাবৃষ্টির অঞ্চলে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে খাদ্য উৎপাদনে আনা হয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। উপগ্রহগুলো বর্তমানের সর্বাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন নামক প্রক্রিয়ার দ্বারা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবরাখবর, তথ্য ও ছবি সপ্তাহ করা যায়। আলোক তত্ত্ব নামক নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কারের ফলে টেলিফোনে কথা বলার পাশাপাশি পরস্পরের ছবি দেখা যাচ্ছে। জন্মপূর্ব রোগ নির্ণয় চিকিৎসায় সাফল্যে ক্ষেত্রে এক বড় রকমের উত্তরণ। চিকিৎসা প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্ভাবনা হাজির করেছে জিন প্রতিস্থাপন। কর্নিয়া, বৃক্ক, অস্থিমজ্জা, হৃদপিন্ড, ফুসফুস এবং যকৃতের মতো অঙ্গ- প্রত্যতা প্রতিস্থাপনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাফল্য অভাবনীয়। রোগ নির্ণয়ে ফাইবার অপটিকস ব্যবহার এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী পদ্ধতি। এই অপটিক ফাইবার ব্যবহার করে ক্যান্সারের নমুনা সংগ্রহ, অনাকাঙ্খিত বস্তুসামগ্রী ও ছোট ছোট টিউমার অপসারণ ও রক্তবাহী নালিকা মেরামত করা যাচ্ছে। অতিকম্পনশীল শব্দ ও লেজার সাম্প্রতিক চিকিৎসা পদ্ধতির এক বৈপ্লবিক সংযোজন। ক্যান্সারের প্রতিষেধক, এইডস-এর প্রতিষেধক ও অন্যান্য মারাত্মক কিছু রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার, পরমানু চিকিৎসা থেকে সর্বাধুনিক সংযোজন। সম্প্রতি কৃত্রিম হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমানে আবহাওয়ার খবরাখবর বের করতে গিয়ে বিজ্ঞান তার প্রচন্ড ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর সাহায্যে জানা যাচ্ছে সম্পদ, তেল ও গ্যাসের উৎস, মাটির উপাদান ও জলজ সম্পদ সম্পর্কে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাম্প্রতিক কালে কৃত্রিম আবহাওয়া তৈরি, কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো, এমনকি রঙিন ধোয়া দিয়ে আকাশের গায়ে রংধনুও সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে বাঁধ নিয়ে বন্যা জলোচ্ছ্বাসের মতো দূর্যোগকেও থামিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে এই বিজ্ঞানের কল্যাণেই। আর সেই দিন খুব বেশি দূরে নয় যখন মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যেই আবহাওয়ার ওপর কর্তৃত্ব করবে।

সর্বোপরি সর্বাধুনিক বিজ্ঞানের অনন্য অবদান হলো মহাকাশ অভিযান ও মহাকাশ বিজয়ে। সূক্ষাতিসূক্ষ্ম গণনা, নির্ভুল দিকস্থিতি নির্ণয়, পরিমিত তাপমাত্রা সংরক্ষণ, মহাকাশ অভিযানের হুবহু ছবি পৃথিবীতে প্রেরণ করার মতো অকল্পনীয় কাজও বাস্তবে পরিণত হয়েছে বিজ্ঞানের কল্যাণে। গ্রহে-উপগ্রহে বিভিন্ন নভোযান ও নভোখেয়া উৎক্ষেপনেও বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক প্রযুক্তিনির্ভর যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা 'নাসা' মহাকাশ জয়ের নেশায় প্রতিনিয়ত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার : সভ্যতার শুরু থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় বিশ্লেষণ করে স্বপ্নময় বাস্তবতার রূপ পরিলক্ষিত হয়। যার রূপকার হলো বিজ্ঞান। বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে নিজেদের টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। অক্সিজের ছাড়া যেমন প্রাণিকুলের জীবন ধারণের কথা কল্পনা করা যায় না, তেমনি বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আধুনিক সভ্যতাকেও কল্পনা করা যায় না। মানব সভ্যতার অগ্রগতির মূলে রয়েছে বিজ্ঞান এবং এই বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সঠিক পথে পরিচালনার ওপরই নির্ভর করছে আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রা।

Comments

Previous Post Next Post